*আমি সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানের উপর বাংলায় একটি বই লিখছি, যার উদ্দেশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে পড়ানো হয়, পদার্থবিজ্ঞানের এমন সব বিষয়বস্তুর সাথে বাংলায় শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেয়া। এই ওয়েবসাইটে আমি নিয়মিত এই কাজটিও আপলোড করবো।
ভূমিকা
পদার্থবিজ্ঞান বিজ্ঞানের সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত শাখাগুলোর একটি। মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যালাক্সি (Galaxy – ছায়াপথ) থেকে শুরু করে সবচেয়ে ছোট সাবঅ্যাটোমিক পার্টিকেল (Subatomic Particle – উপপারমাণবিক কণিকা) পর্যন্ত সব বস্তু এবং তাদের মিথষ্ক্রিয়া পদার্থবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়। সুতরাং আমাদের চারপাশের সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে পদার্থবিজ্ঞানের সুত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা যেতে পারে, তবে সেটা কতোটুক সঠিক বা ভুল হবে সেটা বিতর্কের বিষয়।
পদার্থবিজ্ঞান একটি ব্যবহারিক বিজ্ঞান, যদিও এর অনেক তত্ত্বীয় ভাগ রয়েছে, এরপরেও তার প্রমাণ সবসময়ই পরীক্ষণ দ্বারা যাচাই করা হয়ে থাকে, যা মূলত পদার্থবিজ্ঞানকে দর্শন থেকে আলাদা করেছে। প্রাকৃতিক নিয়মকানুনের ব্যাখ্যা হিশেবে ‘পদার্থবিজ্ঞান’ বা ইংরেজী ‘ফিজিক্স’ (Physics) শব্দের ব্যবহার খুব বেশীদিনের নয়। মোটামুটিভাবে প্রায় ১৮০০ সাল পর্যন্ত জ্ঞানের এই শাখা ‘প্রাকৃতিক দর্শন’ (natural philosophy) নামে পরিচিত ছিল। যেমন, গতিসূত্র বিষয়ক নিউটনের বিখ্যাত বইয়ের নাম ছিল, ‘Mathematical Principles of Natural Philosophy’, যার বাংলা করলে দাড়ায়, ‘প্রাকৃতিক দর্শনের গাণিতিক সূত্রাবলী’। ইউরোপে ‘আলোকায়ন যুগের’ (Enlightenment Age) (১৬৮৫-১৮১৫) এর শেষে এসে জ্ঞানচর্চাকারীদের মাঝে তত্ত্ব থেকে পরীক্ষণ বেশী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় প্রাকৃতিক দর্শন পদার্থবিজ্ঞানে এবং আলকেমি (Alchemy – অপরসায়ন) রসায়নে (Chemistry) পরিণত হয়। ‘Science’ বা ‘বিজ্ঞান’ শব্দের ব্যবহারও একই সময়ে শুরু হয়। অর্থাৎ পদার্থবিজ্ঞানের যে বর্তমান রুপ তা খুব বেশীদিনের নয় এবং এর বেশীরভাগ গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারই গত ৫০০ বছরের মধ্যে হয়েছে। এই ৫০০ বছরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, পদার্থবিজ্ঞান মূলত দুই ধরণের পন্থা অবলম্বন করে কোনো তত্ত্ব প্রদান করে থাকে। প্রথম পন্থাটিকে বলা যেতে পারে, কেপলারের পন্থা বা ‘উপাত্তের (Data) ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত’ (Data-driven Approach) এবং দ্বিতীয় পন্থাটিকে বলা যেতে পারে নিউটনের পন্থা বা ‘প্রাথমিক/মৌলিক নিয়মের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত’ (First-principle Approach)। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, বিজ্ঞান এবং প্রকৌশলের সকল শাখার সকল গবেষণা কোনো না কোনোভাবে এই দুইটি পন্থার যেকোনো একটি ব্যবহার করে থাকে। কেপলারের নিয়মে নতুন তত্ত্বের জন্য পর্যবেক্ষণ লব্ধ উপাত্তের উপর ভিত্তি করে নতুন তত্ত্বের অবতারণা করা হয়ে থাকে। বর্তমানে পদার্থবিজ্ঞান বাদে অন্যান্য শাখায় মূলত কেপলারের পন্থা বেশী ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যেমন, উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, জিনবিজ্ঞানে প্রধানত জিনে থাকা উপাত্তের বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে করে নতুন তত্ত্বের অবতারণা করা হয়। একইভাবে রসায়নের মৌলিক পাঁচটি সূত্রই উপাত্তের ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হয়েছে। অপরপক্ষে নিউটনের পন্থা তাঁর সময় থেকে এখন পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানের প্রধান পন্থা হিশেবে চলে আসছে। এই পন্থায় কোনো সিস্টেম (System – ব্যবস্থা) (সাধারণত পদার্থবিজ্ঞানের পরিভাষায় সিস্টেম বলতে এমন কোনো স্থানকে বোঝানো হয়ে থাকে যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের সুত্রগুলো কাজ করে) এর গাণিতিক নিয়মসমূহকে প্রথমে চিহ্নিত করা হয় এবং তার ভিত্তিতে নতুন তত্ত্বের সৃষ্টি করা হয়। পদার্থবিজ্ঞানের প্রধান প্রধান সকল সূত্র এবং তত্ত্ব এই পন্থায় সৃষ্টি করা হয়েছে, যেমন, নিউটনের গতি এবং মহাকর্ষ সূত্র, ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্ব, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রভৃতি। তবে বর্তমানে কম্পিউটার বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতির ফলে মেশিন লার্নিং (Machine Learning – মেশিন লার্নিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (Artificial Intelligence) একটি শাখা) এর ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং উপাত্তের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আস্তে আস্তে পদার্থবিজ্ঞানেও কেপলারের পন্থা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
জ্ঞানের যেকোনো শাখায় ভালো করতে হলে প্রধানত ওই শাখার বিভিন্ন সমস্যা (পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে গাণিতিক সমস্যা) সমাধানের দক্ষতা অর্জন করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষায় প্রায় কখনোই এই দক্ষতার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয় না, অন্তত আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাতে এরকমই মনে হয়েছে। আমরা মূলত বিভিন্ন তত্ত্বের ব্যুৎপত্তি (Derivation) নির্ণয় করতে শিখি কিন্তু তার প্রয়োগ প্রায় কখনোই আমরা করি না। ফলে আমাদের মধ্যে সমস্য সমাধানের যে দক্ষতা তা কখনোই গড়ে ওঠে না। পরবর্তীতে যদি কেউ পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যায়, তাকে শুরুর দিকে এর ফলে প্রবল সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সুতরাং পদার্থবিজ্ঞানে ভালো করতে হলে অবশ্যই সমস্যা-সমাধানের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এছাড়া সাধারণ পদার্থবিজ্ঞান যে শুধুমাত্র পদার্থবিজ্ঞানে ভালো করতে হলে অবশ্যই সমস্যা-সমাধানের দক্ষতা অর্জন করতে হবে। এছাড়া সাধারণ পদার্থবিজ্ঞান যে শুধুমাত্র পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাই পড়ে এমন নয়, বিজ্ঞান এবং প্রকৌশলের প্রায় সব শাখার শিক্ষার্থীদেরও পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের উপর একটি সাধারণ ধারণা রাখতে হয়। তাই বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের যেকোনো শাখায় ভালো করতে হলে, সাধারণ পদার্থবিজ্ঞানে ভালো হওয়া, অর্থাৎ পদার্থবিজ্ঞানের সমস্যা-সমাধানের দক্ষতা থাকা খুবই জরুরী।
আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে অনেক জায়গায় ইংরেজীতে পদার্থবিজ্ঞান পড়ানো হয়ে থাকে, যার উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মহৎ। যেন এর ফলে শিক্ষার্থীরা একই সাথে পদার্থবিজ্ঞান এবং ইংরেজী উভয় বিষয়েই ভালো হতে পারে। কিন্তু দ্বাদশ শ্রেণী অতিক্রম করা বেশীরভাগ শিক্ষার্থী বাংলাদেশে এতটা দক্ষতা রাখে না যে তাঁরা নিজে নিজে সব পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক পড়ে সেগুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারবে, কারণ পাঠ্যপুস্তকসমূহের ইংরেজী, প্রতিদিনের ব্যবহার্য সাধারণ ইংরেজী থেকে কঠিন হয়ে থাকে। এর ফলে অনেকেই শুরুর দিকে না বুঝতে পেরে পদার্থবিজ্ঞান থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে এবং পরবর্তীতে বোঝার পরিবর্তে মুখস্ত করার প্রতি ঝোঁক অনুভব করে। এছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো বাংলায়ই পদার্থবিজ্ঞানে শেখানো হয়ে থাকে, কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের একইভাবে সমস্যা-সমাধানে মনোযোগী না করে তত্ত্ব এবং তার ব্যুৎপত্তি নির্ণয়ে মনোযোগী করানো হয়। এই পুরো ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরাতো প্রবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ই, একই সাথে প্রচুর সম্পদেরও অপচয় হয়ে থাকে, যা আমাদের মতো স্বল্প আয়ের দেশের জন্য খুবই নেতিবাচক। অন্তত স্নাতক পর্যায়ে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা করার জন্য বেশীরভাগ দেশেই উৎসাহ দেয়া হয়ে থাকে, কেননা কমবয়েসে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা করলে তা আত্মস্থ করা এবং পরবর্তীতে প্রয়োগ করার দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। ইংরেজী একটি ভাষা, কেউ ইংরেজীতে ভালো হলে মাতৃভাষায় শেখা জ্ঞান ইংরেজীতে প্রয়োগ করা তার জন্য তেমন কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু বাংলাদেশে অথবা বাংলাভাষায় পদার্থবিজ্ঞানের উপর লেখা খুব বেশী পাঠ্যপুস্তক এমন নেই, যেখানে সমস্যা সমাধানকে মূলে রাখা হয়েছে। আমার বইটির মূল উদ্দেশ্য আসলে এটাই, যেন আমাদের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা নিজ ভাষায় পদার্থবিজ্ঞান অনুশীলন করতে পারে এবং সমস্যা-সমধানের দক্ষতা অর্জন করতে পারে। বইটি কারো কাজে আসলে আমার এই পরিশ্রম নিঃসন্দেহে সার্থক হবে। এখানে আরেকটি ব্যাপার উল্লেখ করা জরুরী, বইটিতে আমি পদার্থবিজ্ঞানের বিভিন্ন পরিভাষাকে ইংরেজীতে যা বলে সেরকম ভাবেই রাখার চেষ্টা করেছি এবং বাংলা পরিভাষাকে অনুবন্ধনীর ভেতরে ব্যবহার করেছি। এই ব্যবহার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যেহেতু পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষার্থীরা উচ্চতর-শিক্ষার সময়ে ইংরেজীতে এই পরিভাষাগুলো ব্যবহার করবে, তাই আমি চেয়েছি তাদের এখনি এগুলোর সাথে পরিচিত করতে যেন পরবর্তীতে পরিভাষাগুলো অনুবাদ করে নেয়ার প্রয়োজন না পড়ে।
বইয়ের বিভিন্ন অংশে মুদ্রণজনিত এবুং অনুবাদজনিত কোনো ত্রুটি থাকলে, আমাকে জানালে কৃতার্থ হবো। এছাড়া কোনো অংশ নিয়ে কোনো পরামর্শ থাকলেও আমাকে জানালে, আমি সেই অনুযায়ী পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করার চেষ্টা করবো।
তামিম
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২
2 responses to “সাধারণ পদার্থবিজ্ঞান – ১”
খুবই চমৎকার হয়েছে। আপনার লিখা আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
LikeLike
ধন্যবাদ কাল্লু!
LikeLike