আমরা কেন গল্প ভালোবাসি? কেন বারবার ফিরে যাই একই বইয়ে, একই ছবিতে, বা অন্য কোনো মাধ্যমে, যেখানে শেষটা আমরা আগে থেকেই জানি? কেন এমন মানুষদের জন্য মন খারাপ হয়, যাদের কোনো অস্তিত্ব নেই; কেন তাদের জয়ে আমরা উল্লসিত হই, আর কেনই বা গল্প শেষ হবার অনেক পরেও তাদের দুঃখের ভার বয়ে বেড়াই? গল্প সবসময় আমাদের ঘিরে থাকে, শিশুদের ঘুম পাড়ানোর গল্প, বন্ধুদের আড্ডার গল্প, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম পেরিয়ে হাতবদল হয়। আমরা গল্প বলি, গল্প নিয়ে তর্ক করি, আবার কেন গল্পের কাছেই বারবার ফিরে যাই? কারণ গল্প কেবল আমাদের কাছে শুধু বিনোদন নয়, গল্প এক ধরনের চিন্তার পরীক্ষা (thought experiment), যেখানে আমরা ভাবনাকে ছুঁয়ে দেখি, তেমন কোনো ঝুঁকি না নিয়েই।
গল্প কেবল আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়; এটি জীবন থেকেই জন্ম নেয়। আমরা যা চাই, যা ভয় পাই, যা ঈর্ষা করি, যা আশা করি, আর যা নিয়ে অনুতপ্ত হই, গল্প সেসব অভিজ্ঞতা দিয়েই রূপ নেয়। কোনো গল্প পড়তে বা দেখতে গিয়ে আমরা শুধু ঘটনাপ্রবাহ অনুসরণ করি না; আমরা আসলে কল্পনায় নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাই। এমন অভিজ্ঞতার, যেগুলো বাস্তব জীবনে করা আমাদের জন্য নিরাপদ বা সহজ না। প্রতিটি সাহিত্যকর্ম, নিজের মতো করে, কিছু প্রশ্ন তোলে। যেমন, সুন্দর জীবন বলতে কী বোঝায়? ক্ষমতা কার হাতে যায়, আর কেন? কেন কেউ কেউ সফল হয়, আর কেউ কেউ ব্যর্থ হয়, যদিও অনেকসময় দু’পক্ষকেই সমানভাবে যোগ্য মনে হয়? কোন মিথস্ক্রিয়াকে অর্থবহ বলা যায়? কোনটা ভালো, আর কোনটা খারাপ? গল্পেরা প্রায় কখনোই এসব প্রশ্নগুলো সরাসরি করে না; চরিত্র, সিদ্ধান্ত, সংঘাত, আর পরিণতির মধ্য দিয়েই প্রশ্নগুলো সামনে আনে। আর সাহিত্য সমালোচনার অস্তিত্ব এই কারণেই আছে, কারণ এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনাআপনি পাওয়া যায় না।
সহজভাবে বললে, সাহিত্য সমালোচনা হলো সাহিত্য নিয়ে ভাবা, উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, কিংবা অন্য যে কোনো ধরণের সাহিত্য, এবং সেই ভাবনাটাকে ভাষায় ব্যাখ্যা করা। অর্থাৎ জিজ্ঞেস করা: কোনো চরিত্র কেন এই কাজটি করলো, কেন কোনো মুহূর্ত আমাদের দুঃখী বা আশাবাদী করলো, যদিও সেখানে দৃশ্যত কিছুই ঘটেনি, কিংবা কেন কোনো সমাপ্তি আমাদের কাছে তৃপ্তিকর বা অন্যায্য মনে হলো। অনেক সময় আমরা এসব প্রতিক্রিয়া বুঝে ওঠার আগেই অনুভব করি; সমালোচনা হলো একটু থেমে দাঁড়িয়ে চিন্তা করা যে এই অনুভূতিগুলো এলো কোথা থেকে? একটি সাহিত্যকর্মকে পাজলের মতো করে ভাবা যায়। সাহিত্য সমালোচনা জানতে চায়, পাজলের একটি অংশ কীভাবে অন্য একটি অংশের সঙ্গে খাপ খায়, আর সবশেষে সম্পূর্ণ পাজল কী ছবি তৈরি করে। এটি হয় দুটি পরস্পর-সম্পর্কিত প্রশ্নের মাধ্যমে: এই সাহিত্যকর্মটি কীভাবে অর্থ তৈরি করে, আর সেই অর্থ কেন গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই সাহিত্য সমালোচনা কেবল ঘটনার সারসংক্ষেপ নয়, বুদ্ধিমান শোনানোর জন্য জটিল পরিভাষার ব্যবহার নয়, কিংবা প্রমাণ ছাড়া ছুড়ে দেওয়া মতামতের সমষ্টিও নয়। বরং এটি একটি চেষ্টা, সাহিত্যকর্মটিকে ভিত্তি করে দেখানোর চেষ্টা যে অর্থ কীভাবে তৈরি হয়, এবং সেই অর্থের পক্ষে কি কি যুক্তি রয়েছে।
সাহিত্য সমালোচনা অনেক সময় একটি সাহিত্যকর্মকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। সাধারণভাবে এই দৃষ্টিকোণগুলোকে লেন্স বা পাঠ বলা হয়। কোনো ধরণের পাঠ চরিত্রের দিকে নজর দেয়, তারা কী চায়, কী ভয় পায়, আর তাদের সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে গল্পকে এগিয়ে নেয়। আরেক ধরণের পাঠ মূলভাবের (theme) দিকে তাকায়, জিজ্ঞেস করে, কোন বড় ধারণাগুলোর কাছে রচনাটি বারবার ফিরে আসে। অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের দিকে মনোযোগ দেয়, দেখে কার হাতে ক্ষমতা আছে, কার হাতে নেই, আর সেই সম্পর্কগুলো কীভাবে ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করে। আবার আরেকটি ধরণ লেখকের দিকে তাকায়, কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হলো, আর লেখকের কোন চিন্তা বা অভিজ্ঞতা এই রচনাটিকে তার চূড়ান্ত রূপ দিয়েছে। এই প্রতিটি দৃষ্টিকোণ আলাদা আলাদা বিষয়ের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, আর প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রকাশ করতে পারে। তবে এর কোনোটিই এমন কিছু প্রকাশ করে না যা দ্ব্যর্থবোধক নয়। একই সাহিত্যকর্মের একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ সম্ভব, আর সেটাই একে সার্থক করে তোলে, একই সঙ্গে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার ক্ষমতা শেখায়।
যেমন অনেক সাহিত্যকর্মেই একটি সফরের উপস্থিতি থাকে। কোনো চরিত্র ঘর ছাড়ে, নানা বাধার মুখোমুখি হয়, পথে অন্যদের সঙ্গে দেখা করে, আর শেষে বদলে যাওয়ার পরে ফিরে আসে। সহজভাবে দেখলে, এটি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার স্বাভাবিক গল্প বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু মন দিয়ে পড়লে বোঝা যায়, এই সফর খুব কম ক্ষেত্রেই কেবল ভ্রমণের কথা বলে। বেশির ভাগ সময়ই এটি উন্নতি, ক্ষতি, আত্মপরিচয় লাভ, কিংবা মোহভঙ্গের প্রতীক হয়ে ওঠে। চরিত্রগুলো যে জায়গাগুলোর ভেতর দিয়ে যায়, যে বাধাগুলোর মুখোমুখি হয়, এবং যেভাবে সে ফিরে আসে, সবকিছুই দেখায় সে কীভাবে বদলেছে, আর সেই বদলের মূল্য আসলে কি ছিলো। এভাবে এই যাত্রাকে দেখলে গল্পের ঘটনাগুলো অস্বীকার করা হয় না; বরং যাত্রাই হয়ে ওঠে অর্থ নির্মাণের একটি উপায়, ঘটনাগুলোর নিছক ধারাবিবরণী নয়।
সাহিত্য সমালোচনা অনেক সময় যতটা গুরুগম্ভীর শোনায়, বাস্তবে ততটা হওয়া ঠিক না। এটা অনেকটা এরকম যে, যখন কেউ কোনো বই বা সিনেমা নিয়ে খুব আগ্রহী হয়ে পড়ে এবং সেটা নিয়ে কথা বলা বন্ধ করতে পারে না, সে তখন তর্ক করে, ব্যাখ্যা দেয়, মিল খোঁজে, আর একই বিষয় নিয়ে বারবার কথা বলতে থাকে। এই অর্থে সাহিত্য সমালোচকেরা সেই নিবেদিত ভক্তদের থেকে খুব একটা আলাদা নন , যারা তাদের প্রিয় কাজগুলো নিয়ে দীর্ঘ বিশ্লেষণ করে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, সাহিত্য সমালোচনা তাদের আরও যত্নশীল হতে বলে, খেয়াল করে দেখতে বলে, আর যা বলছে তার পক্ষে প্রমাণ হাজির করতে বলে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত সাহিত্য সমালোচনা মানে হলো সাহিত্যের প্রতি অনুরক্ত হওয়া, এই অনুরাগ উপভোগ করা, আর এটা বুঝতে পারা যে, কোনো একটি সাহিত্যে যতবারই ফিরে যাওয়া হোক না কেন, সবসময়ই দেখার মতো নতুন কিছু না কিছু থাকে।